
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, মাদক, ইভটিজিং ও বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান, নারী ও শিশুদের অধিকার সুরক্ষা, জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে
উপজেলা জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরাম (GEF)-এর সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের ত্রৈমাসিক অ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি)-এর আয়োজনে এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর সহযোগিতায় EmpowerHer প্রকল্পের আওতায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরামের সভাপতি মোছা. মুক্তি খাতুন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রায়গঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মো. আবু সাঈদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হাসান শেখ, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খাদিজা নাসরিন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস মনিটরিং অফিসার শিপন চন্দ্র নাগ। সভার সঞ্চালনা ও সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন রায়গঞ্জ উপজেলা ফ্যাসিলিটেটর বাপ্পী সরকার।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. আবু সাঈদ নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলা, অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং কোনো ঘটনা ঘটলে তা গোপন না রেখে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, মাদক ও পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণ, জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরামের সদস্য এবং প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হাসান শেখ সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করেন।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম যুব সমাজকে দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগ্রহী যুবক-যুবতীরা কম্পিউটার ও আইসিটি, গ্রাফিক ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং/ডিজিটাল দক্ষতা, সেলাই ও পোশাক তৈরি, গবাদিপশু-পোল্ট্রি পালন, মৎস্যচাষ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ নিতে পারেন।
অন্যদিকে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খাদিজা নাসরিন নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া এবং নারীর নেতৃত্ব বিকাশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সরকারি কার্যক্রমের বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি জানান, জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরামের সদস্যদের মধ্যে যারা প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী, তারা আবেদন করলে যোগ্যতা ও সুযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করার চেষ্টা করা হবে।
এ সময় সরকারি সেবাগুলো ইউনিয়ন পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরামের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বিশেষ অতিথিরা ইউনিয়ন জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরামের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের যোগাযোগ নম্বর সংগ্রহ করেন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ ও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সভায় রায়গঞ্জ উপজেলা জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরামের সহ-সভাপতি মো. আব্দুর রাজ্জাক এবং সাধারণ সম্পাদক সুশান্ত কুমার তালুকদার রায়গঞ্জ উপজেলার নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার, হত্যা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তারা এসব অপরাধ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
এ ছাড়া ধানগড়া ইউনিয়ন জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরামের সভাপতি মোছা. শিউলি ইয়াসমিন এবং ঘুড়কা ইউনিয়ন জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরামের সভাপতি মোছা. শিউলি খাতুন রায়গঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে আলোচনা করেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা ও শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
মুক্ত আলোচনায় রায়গঞ্জের পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন সমস্যা ও সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেন ঘুড়কা ইউনিয়ন জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফোরামের সহ-সভাপতি আলহাজ্ব আলী এবং সদস্য নাজমুল হক কাজল। তারা স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় তথ্য সংগ্রহকারী (Fact Finder)-দের কার্যক্রম, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যথাযথভাবে তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্তকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়গুলো উপস্থাপনের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার ভিকটিম ও ভিকটিম পরিবারের প্রয়োজনীয় সহায়তা, আর্থিক সহযোগিতা, আইনগত সহায়তার সঙ্গে সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় সেবায় পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
বক্তারা বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, মাদক, ইভটিজিং কিংবা যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ শুধু প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়; বরং পরিবার, সমাজ, স্থানীয় নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নাগরিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত তথ্য প্রদান ও ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো গেলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সভায় EmpowerHer প্রকল্পের মাধ্যমে নারী ও কিশোরীদের অধিকার, জেন্ডার সমতা, নিরাপত্তা, নেতৃত্ব এবং সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সবশেষে উপস্থিত অতিথি ও সভাপতির সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
আয়োজনে: ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি)
সহযোগিতায়: মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)
Reporter Name 








