
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা বাজারে শনিবার সকালে কয়েকজন মানুষকে হাতে কিছু কাগজপত্র নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়। কারও হাতে হাসপাতালের কাগজ, কারও হাতে মামলার নথি। পথচারীদের কাছে গিয়ে তাঁরা একটি শিশুর গল্প বলছিলেন। সেই শিশুর বয়স ১২ বছর। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। মানসিক প্রতিবন্ধী। পরিবারের অভিযোগ, এক মাস আগে শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কিন্তু এখনো বিচার মেলেনি।
শিশুটির বাবা মো. আব্দুল আওয়ালের কণ্ঠে হতাশা আর অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, “আমার মেয়েটা এখনো অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে। চিকিৎসা করাতে করাতে আমরা নিঃস্ব হওয়ার পথে। মেয়েটা ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর মেডিকেল রিপোর্টও আছে। তারপরও কেন বিচার হচ্ছে না, আমি বুঝতে পারছি না।”
রায়গঞ্জ পৌরসভার পূর্ব লক্ষীকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ওই শিশুটি নানার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করে। বাবা-মা জীবিকার তাগিদে ঢাকায় একটি বেসরকারি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন।
পরিবারের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে পূর্ব লক্ষীকোলা গ্রামের বেল্লাল হোসেনের ছেলে শান্ত (২৫) শিশুটিকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার পর শিশুটি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রস্রাবে সমস্যা দেখা দেয়। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পেরে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করান। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে ঘটনার পর শুধু বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি নয়, আপোষের চাপও সহ্য করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুল আওয়াল বলেন, “ঈদুল আজহার দিন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ২০ থেকে ২৫ জন লোক নিয়ে আমার বাড়িতে আসে। তারা বারবার আপোষ-মীমাংসার জন্য চাপ দেয়। বিভিন্নভাবে টাকা-পয়সার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। কিন্তু টাকা দিয়ে আমি কী করব? আমার মেয়ের সম্মান কি টাকায় ফিরে আসবে? একজন বাবা হিসেবে আমি শুধু আমার মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার চাই।”
শনিবার সকালে চান্দাইকোনা বাজারে বিচার দাবিতে ঘুরে বেড়ানো স্বজনদের মধ্যে ছিলেন শিশুটির এক মামাতো ভাইও। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমরা বিচার চাওয়ায় বিভিন্নভাবে চাপের মুখে আছি। মীমাংসা করতে রাজি না হওয়ায় আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
তিনি আরও বলেন, “শিশুটি এখনো অসুস্থ। পরিবারটি চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটের মধ্যে আছে। আমরা শুধু চাই অপরাধী আইনের আওতায় আসুক।”
এ ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্তদের নিকট বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের বাড়িতে তাদের পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি তাদের মুঠোফোনটিও বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে রায়গঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম খান বলেন, “মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ভয়ভীতি দেখানো বা আপোষে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটিও আইনগতভাবে দেখা হবে।”
এক মাস পেরিয়ে গেলেও অসুস্থ শিশুটির পাশে বসে আজও অপেক্ষা করছেন তাঁর বাবা। আদালত, প্রশাসন কিংবা সমাজ—কেউ একজন যেন তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেন, ‘আমার মেয়ের অপরাধটা কী ছিল?’
Reporter Name 








